হৃদয়ের কথা মনে হচ্ছিল আজ!
হে হৃদয়- মোড়ে যেখানে বন্ধুরা মিলে চা খাই আর আড্ডা দেয় সেখানেয় একটি চেপ স্টেশনে কাজ করে। বয়স ৮-৯ হবে। কথায় কথায় একদিন তার গ্রামের বাড়ী কোথায় জানতে চেয়েছিলাম, জানতে পারলাম আমার জেলাতেয় তার বাড়ী। ইট কাঠের এই ঢাকাতে দুই ভাই মিলে কাজ করে বাড়ীতে টাকা পাঠায়। সকাল ৯ থেকে রাত ১০ টা পযর্ন্ত কাজ করে উত্তরার এই চেপ স্টেশনটিতে। জানতে চেয়েছিলাম পড়াশুনা করে কিনা! তার সহজ সরল জবাব ছিল
- করতাম! সাইরা দিসি, পড়ুনের সময় পাইনা,কাম করুন লাগে, ট্যাকা জমানো লাগে! এই লাইগ্যা পড়িনা।
-আমি যদি তোমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় তাহলে পড়বে?
তখন তার চোখে মনে হয় হালকা হাসির রেখা দেখেছিলাম, কিন্তু কোন জবাব না দিয়ে সে চলে গিয়েছিল।
ওই দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় তার সাথে দেখা হয়,শুধু মাত্র কেমন আছো এটাই জানতে চাই!
আর কিছু করতে পারিনি!
গত রবিবার ঢাকার নিকুন্জে হাটছিলাম বন্ধুরা মিলে- দেখলাম এক বাবা তার বাচ্চা ছেলেকে মারছে! কারন সে নাকি বাবার দেয়া কাজে না গিয়ে মাঠে খেলছিল!
হে আপনারা সচেতন মানুষ যারা, তারা যা ভাবছেন আমিও তখন তাই ভাবছিলাম।
আসুন এক নজরে দেখে নেয় শিশু নির্যাতন সর্ম্পকিত কিছু আইন এবং পরিসংখ্যান--
Universal Declaration of Human Rights (UDHR) এর ২৫ নং অনুচ্ছেদে বলা আছে- অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান,শিক্ষা,স্বাস্থ নিশ্চিত পূর্বক প্রতিটি শিশুর জন্মকাল,শিশুকালে ঠিক ভাবে বেড়ে উঠা নিশ্চিত করতে হবে।
গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে -
অনুচ্ছেদ-৭- সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভ করবে।
অনুচ্ছেদ-২৮(৪)-নারী ও শিশুদের উন্নতির জন্য রাষ্ট্র বাদ্য থাকবে।
অনুচ্ছেদ-৩৪-যেকোন ধরনের জবরদস্তী কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শিশুদের অধিকার,শিশুদের নির্যাতন তথা খারাপ কাজ থেকে রক্ষা করা বা সুন্দর ভাবে বেড়ে উঠার জন্য, অবহেলা রোধ করার জন্য, শিশু উন্নয়নের জন্য ৩৫ টির বেশি আইন রয়েছে। শুধু সমস্যা প্রয়োগে।জারী করা হয়েছে জাতীয় শিশু নীতি,২০১১
শিশু আইন,১৯৭৪.
এই আইনটির মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা , বেড়ে উঠার স্বাধীনতা,নিশ্চিত করার কথা বলা আছে।
সরকারকে শিশূদের অধিকার নিরাপত্তা প্রতিষ্টার জন্য বাধ্যকতা জারী করা হয়েছে।
এই আইনে- জুবেনলি কোর্টের কথা বলা হয়েছে। পুলিশ স্টেশনে শিশুদের সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে তা বলা হয়েছে,শিশুদের নিরাপদে রাখতে যেকোন ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ লেবার আইন,২০০৬
১৮ বছরের কম বয়স্ক কোন শিশুকে ঝুকির্পূণ কাজে লাগানো যাবে না।
১৮ বছরের কম বয়স্ক কোন মেয়ে শিশুকে গনিকা বৃত্তির কাজে আনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দন্ডবিধি,১৮৬০-
৯ বছরের কম বয়স্ক কোন শিশুকে অপরাধী হিসাবে দায়ী করা যাবে না।
শিশু পাচার,ক্রয়-বিক্রয়,গনিকা বৃত্তি,শিশু অপহরণ,শিশু ধর্ষন,প্ররোচনায় অপরাধ করানো, ইভটিজিং আইনত দন্ডনিয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে। (ধারা-,৮২,৮৩,৩৭২,৩৭৩,৩৭৫,৩৬৬,৫০৯)
এই সব অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ড পযর্ন্ত শাস্তি হতে পারে।
এছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে।
------------------------------------------------------------------------
কেন হয় শিশু নির্যাতন?
সবল দূর্বলের উপর আক্রমণ করবে এটা যেন আমাদের চিরায়ত রীতি হয়ে বার বার চোখের সামনে ধরা দেয়।
আজকে যে শিশু কাল হবে সে বিশ্বের রাজা! এটা আমরা সবাই বলি- কিন্তু সেই রাজাকে রাজার মত বেড়ে উঠতে দেয় না! কারণ-আমাদের মূখ্যতা,নিচু মনের পরিচয়,মানুষের প্রতি ভালবাসার অভাব তাদের কে জেনে না জেনে অঙ্কুরেয় বিনাশ করতে ব্যস্ত ! শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য যে পরিবেশটা প্রয়োজন সেটা আমরা সরবরাহ করতে পারিনা। আমাদের আছে সাধারণ সেন্সের অভাব। নিজে বড় হ্ওয়া মানেয় পৃথিবিটা বড় হ্ওয়া নই তা আমরা বুঝতে চাইনা। তাই করি নির্যাতন।
বাংলাদেশের শিশু সংখ্যা ২০০১ সালে প্রায় ২ কোটি যার মাঝে ১-১৪ বছর বয়সি ছিল দেড় কোটি।
এই থেকে বলা যাবে না প্রতিটা শিশুই ঠিক ভাবে বেড়ে উঠেছে পরিপূর্ণ পুষ্টি আর অধিকার নিয়ে।
কারন তাদের অর্ধ্যেক বসবাস করে দারিদ্র সীমার নিচে! তাহলে তারা কি তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে সমাজের কাছ থেকে ঠিক মত বেড়ে উঠার বা প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছে! হয়তো পাইনি তাদের অধিকারের পরিবর্তে পেয়েছে নিযার্তন আর অবহেলা।
যেখানে শিশু নির্যাতন আর শিশু অধিকার হরণের হার শুধু বেড়েয় চলছে।
----------------------------------------------------------
""মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে ।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ’পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে ।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে""
হয়তো এই নির্যাতনের ফলে এমন কবিতার বাস্তবায়ন আর হবেনা.. হবেনা শুনা..
"" ইঁদুর দেখে মাম্দো কুকুর বল্লে তেড়ে হেঁকে-
"বলব কি আর, বড়ই খুশি হলেম তোরে দেখে।"""
এমন কথার মাধুরতা আর ভাললাগা...
আমরা চাই প্রতিটি শিশু বেড়ে উঠুক নিজের সবটুকু অধিকার নিয়ে.. কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের স্বপ্ন। তাই সেই স্বপ্ন দেখার রাস্তা বন্ধ করে নিজেকে অন্ধকারে ডুবাবেন না। নিজের সন্তানকে যেমন ভালবাসুন তেমনি রাস্তার বা আপনার বাড়ির পাশের ছোট ঘরের কোমল বাবুটিকেও ভালবাসায় কাছে টেনে আনুন।
প্রিয় কবি সুকান্ত ভট্রাচার্যের কবিতাটি মনে পরছে শুধু...
::যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুমঃ
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।
খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।
সে ভাষা বোঝে না কেউ,
কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।
আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা।
পেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগের
পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর
অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে।
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,
তারপর হব ইতিহাস।::
সকল শিশুর জন্য পৃথিবী হোক স্বপ্ন পুরী..