সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০১১

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও বাস্তবতা অথবা আমাদের অসহায়ত্ব!

যে দেশের প্রধান সম্পদ মানুষ বা জনসংখ্যা, প্রতিদিন ধ্বংস হওয়ার পথে সেই সম্পদ বাচাঁতে আমাদের অবশ্যই গবেষণা লব্ধ ফল নিয়ে কাজ করা উচিত।
সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ নয় প্রয়োজন সচেতন ভাবে প্রতিরোধে কাজ করা। সারা দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে কমপক্ষে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। দুর্ঘটনার জন্য চালকের অসচেতনতা ও অসতর্কতাকে দায়ী করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। আমারাই বা কি করছি সেই সম্পদ রক্ষার জন্য!




প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। কত হাজার হাজার সোনার সংসার এতে তছনছ হয়ে গেছে, কত সম্ভাবনাময় জীবনের প্রদীপ নিভে গেছে অকালে। আর যে পরিবাবের প্রধান ব্যক্তিটি দুর্ঘটনায় মারা যায় সেই পরিবারটি কি অবস্থায় দিনাতি পাত করে তা ভেবে হয়তো চোখের কোণে পানি আসাটা অস্বাভাবিক নই। অনাকাংখিত মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। ঝরে যাচ্ছে মূল্যবান প্রাণ। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় শোকাতুর পরিবারের বিলাপ আর আহাজারিতে ভারী হচ্ছে বাতাস।দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অসময়েই অনেক স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটছে, থেমে যাচ্ছে অনেক পরিবারের গল্প।
দেশের প্রধান তম সড়ক গুলোর খারাপ অবস্থা, ড্রাইভারদের অসর্তকতার সহিত গাড়ী চালনা! আরো অনেক বড় কারণ লুকায়িত রয়েছে এই সব মৃত্যুর পিছনে!

জীবন চলতে চলতে আকসিক ভাবে ঝড়ে পরার পিছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করে সড়ক দুর্ঘটনা।
চালকের বেপরোয়া গতি, খামখেয়ালী, দ্রুত গতিতে গাড়ি চালনার অভ্যাস ,মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং সব আইন অমান্য করা এটা আমাদের ৯৯।৯৯ জন ড্রাইভার দের বৈশিষ্ট্য, এটি একদিনে হয়েছে? তা কখনোয় নই। দিন দিন তারা এই সব করতে করতে অভ্যাসে পরিণত করেছেন। কারণ তাদের কারো কাছে জবাব দিহিতা করতে হয় না। হয় না পরতে কোন ধরনের আইনি সমস্যায়!

আমরা জাতি হিসেবে একটুখানি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতাম যাদের নিয়ে,আর আমাদের অসংখ্য ভাই বোনদের বিনা কারনে অসহায় মৃত্যুবরন করতে হতনা আমাদের একটু সচেতন ভাবে এগিয়ে এলে।

চলুন কিছু পরিসংখ্যান দেখি-
১. চালকের বেপরোয়া গতি, খামখেয়ালী, দ্রুত গতিতে গাড়ি চালনার অভ্যাস ,মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং সব আইন অমান্য করা এটা আমাদের ৯৯।৯৯ জন ড্রাইভার দের বৈশিষ্ট্য ।
২.আসুন দেখি বিগত বছরের সড়ক দূর্ঘনার ভয়াবহ পরিসংখ্যানঃ
সাল______নিহত______আহত/পঙ্গু
১৯৯৪_____৩০১৩_____২৭৩৫ জন
১৯৯৫_____১৬৫৩_____২৮৬৪ "
১৯৯৬_____২০৪১_____৪০৭৬ "
১৯৯৭_____৩১৬২_____৩৯৯৭ "
১৯৯৮_____৩০৮৫_____৩৪৫৩ "
১৯৯৯_____৩৩১৪_____১৯১১ "
২০০০_____৩৪৩০_____৩১৭২ "
২০০১_____৩১০৯_____৩৬০৭ "
২০০২_____৩৩৯৮_____৩০৭০ "
২০০৩_____৩৩৮৯_____৩৮১৮ "
২০০৪_____২৯৬৮_____২৭৫২ "
২০০৫_____৩১৮৭_____৩৭৫৫ "
২০০৬_____৩১৯৩_____২৪০৯ "
২০০৭_____৩৭৪৯_____৩২৭৩ "
২০০৮_____৩৭৬৫_____৩২৮৪ "
২০০৯_____২৯৫৮_____২৬৮৬ "
২০১০_____৪০৬৭_____৪৯৭৫

৩. প্রতি বছরে গড়ে ঘটেছে ৪ হাজার ১’শ ৫২টি দূর্ঘটনা। প্রতিটি দূর্ঘটনায় গড়ে ২ লাখ টাকা ক্ষতি হলে প্রতি বছরে ক্ষতি হয় ৮৮ কোটি ০৫ লক্ষ ৮৮ হাজার ২’শ ৩৫ টাকা। ১৭ বছরে ক্ষতি হয়েছে ১৪১২০০০০০০০ কোটি টাকা।

৪.বেশি। দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার তিন ভাগের মধ্যে দুই ভাগই ঘটছে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলিতে।
৫.রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত পরিবহনের বিপরীতে দেশে অবৈধ চালকের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। অর্থাৎ মোট চালকের ৬১ ভাগেরই নেই কোন বৈধ লাইসেন্স।
৬.গত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ হাজার মানুষ।
৭.২০০৯ সালে শুধু ঢাকাতেই ৩২৪ জন।
৮.এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে ১০ হাজার যানবাহনের দুর্ঘটনায় নিহতের হার প্রায় ১৭০ জন। এবং এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।
৯.মৃতদের শতকরা ৬০ ভাগ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশ এবং ২০ ভাগের বয়স ১৬ বছরের নীচে।
১০.দেশের হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে আসা মোট রোগীর শতকরা ৫৬ ভাগই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার।
১১.ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থায় দুর্ঘটনার শতকরা ৬৪ ভাগই সংঘটিত হয় গ্রামাঞ্চলের সড়কে। আর গ্রামাঞ্চলের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে মহাসড়কগুলোতে।
তথ্য- বাংরাদেশ তথ্য বুরো।দৈনিক পত্রিকা।ও বাংলা ব্লগ সাইট।

রাস্তায় যেন শয়তানের রাজত্ব! প্রতিদিন এই লাশের মিছিলে নাম উঠছে কত রথি মহারথিদের। যাদের মৃত্যু আমাদেরকে এই সমস্যা নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে! নতুবা নই। একজন মায়ের আহাজারির থেকে বড় হয়ে যায় আমাদের কাছে টাকার ঝনঝনানি- যার কারণে অদক্ষ চালকের লাইসেন্স দিয়ে আমরা করছি নতুন প্রাণ সংহারের বন্দোবস্ত!
ক্ষমতা মানুষকে শয়তানে পরিণত করে! হতে পারে সেই শয়তান কারো ঘাড়ে বসে মৃত্যুর মিছিলে পাঠাতে ইন্দন দিচ্ছে।

আরেকটি ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বেশিরভাগই পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য যাদের বয়স ১৬ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। দুর্ঘটনায় কর্মক্ষম ব্যক্তির হঠাৎ মৃত্যু বা পঙ্গু হয়ে পড়ার ফলে পরিবারগুলোর যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে তা লাঘবে ক্ষতিপূরণেরও কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে দীর্ঘকাল ধরে এর মাসুল গুণতে হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে। আহত ও পঙ্গুদের চিকিৎসার খরচ যোগাতে গিয়ে কী ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয় পরিবারগুলোকে সেটি ভুক্তভোগী ছাড়া কল্পনা করা সম্ভব নয়।

যে কারণে ঘটছে:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতি ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। হাইওয়েসহ সকল সড়কে নিরাপত্তা ঘাটতি, বেপরোয়া গাড়ী চালনা, চালনাকালে মোবাইলে কথা বলা, পর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যালের ঘাটতি, ট্রাফিক আইন ও সংকেত সম্পর্কে ড্রাইভার ও অন্যান্যকে উদ্বুদ্ধকরণের এবং সরকারিভাবে ড্রাইভার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা, রাতের আলোর স্বল্পতা ইত্যাদি সড়ক দুর্ঘটনার কারণ। অবৈধ চালক দ্বারা গাড়ী চালনাই দুর্ঘটনার প্রধানতম কারণ বলে সনাক্ত করেছেন অনেকেই। হাইওয়ে পুলিশের রয়েছে হাজারো সীমাবদ্ধতা, ফলে দোষী ব্যক্তিকে পাকড়াও করার ক্ষেত্রে তারা তেমন কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না।
কারনগুলো আমরা সবাই জানি কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখি উপরের কোন সমস্যাটার সমাধান আমাদের বর্তমান এবং বিগত সরকারগুলোর করতে না পারার কথা ? তারা এর বেশির ভাগই একটু স্বদিচ্ছা থাকলে সমাধান করতে পারতেন। শুধু একটখানি স্বদিচ্ছা ! আর আমাদের, চালকদের, কর্তৃপর্ক্ষ নামক ব্যক্তিদের সচেতনতা পারে এই মহামারি আকার ধারণ করা সমস্যাটি সমাধান করতে।
জীবনহানির মতো মর্মন্তুদ ঘটনা দেখে দেখেও দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মানবিক চেতনার স্ফুরণ ঘটেনি। সব মিলিয়ে এখন সড়ক পথে আর স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই।

আইন কি বলে:
মানুষ হত্যা করার শাস্তি মৃত্যু দন্ড বা যাবতজীবন কারাদন্ড। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তার প্রয়োগের সম্ভাবনা আইনে রাখা হয়নি। যার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ হত্যা একটি খুব সাধারণ ঘটনা হিসেবে নেয়া হয়!
১.দ-বিধি ১৮৬০ এর ৩০৪ (ক) ধারায় সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।
২.বেপরোয়া ভাবে যান চালালে ৩ বছরের সাজা বা অর্থ দন্ড হতে পারে ৩০৪(খ) ধারা মতে।
৩.চালক গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বললে ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশের ১৪০ ধারায় মামলা করা হয়। এতে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা এবং বিনাশ্রম এক মাসের জেল দেয়ার বিধান রয়েছে।
খুব সাধারণ সাজা দেয়া হচ্ছে। এবং দেশের প্রেক্ষাপটে প্রকৃত বিচার অনেক দূলর্ভ বস্তু।
আার বাস ড্রাইভার বা বাসটি যদি হয় কোন ক্ষমতাবান মানুষের তাহলে তো কথায় নেই! বিনা বিচারেই খালাস!

রয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ কাউন্সিল। যারা বেকার বসে থেকে সরকারী বেতন নিয়ে ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছেন!

অনুমিত সিদ্ধান্ত:
সড়ত দুর্ঘটনা প্রতিরোধো আমরা যে সব কাজ হাতে নিতে পারি-
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেপরোয়া চালকদের নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যায়।
১.ক্ষমতা শালীদের বাস লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
২.আর গাড়ীর ত্রুটিমুক্ত রাখতে হবে ।
৩.রাস্তা প্রশস্ত বানাতে হবে ।
৪. বৈধ লাইসেন্স ভিত্তিক দক্ষ চালক নিশ্চিত করতে হবে।
৫.চলন্ত গাড়ীর চালকের মোবাইলে কথা বলা নিষিদ্ধ করা হোক এবং এ ব্যপারে যাত্রীসাধারনকে সচেতনতার দায়িত্ব নিতে হবে।
৬.চালকদের আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে।
৭.প্রচলিত আইন সংশোধন করে কঠোর আইন করতে হবে।
৮.আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে।
৯.চালকদের মাসিক কাউন্সিলিং করাতে হবে।
১০.হাইওয়ে পুলিশ বৃদ্ধি সহ টহল, গতি নিরোধক যন্ত্র বসাতে হবে।
১১. রাস্তা পারাপারে ওভার ব্রীজ, ওভারপাস,জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
১২.সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যদের লাইসেন্স দিতে হবে।
১৩.রাজনৈতিকতা থেকে মুক্ত রেকে বিআর টি এ কে মুক্ত ভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
১৪.ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করতে হবে।
এই গুলো আমার কথা। কিন্তু প্রয়োগ আর বাস্তবতা ভিন্ন সেটা আপনি আমি সবাই জানি।
গবেষণা লব্ধি ফলাফল দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।
কোন মন্ত্রীর ক্ষমতায় লাইসেন্স নেয়ার প্রথা বাদ দিয়ে যোগ্যতার মাপকাঠি দিয়ে বিচার করে হবে। সরকারের কিছু কঠোর পদক্ষেপ, চালকের দায়িত্বশীলতা এবং জনসচেতনতা সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাতে পারে।
উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারলে অনেক হৃাস পাবে সড়ক দুর্ঘটনা।

বাস্তবতা:

আইন আছে প্রয়োগ নেই। গাড়ী আছে যোগ্য চালক নেই! প্রশাসন আছে দেখার কেউ নেই। রাস্তার মাঝ দিয়ে দৌড়ে পার হয়ে গেলাম কিন্তু মাথায় আসলো না ওভার ব্রীজ ব্যবহার করার! চালক ফোনে কথা বলছেন কিন্তু যাত্রীরা নির্বাক! সাধারণ মানুষ মরলে কিছুই হয় না,বিশিষ্ট জন মরলে রব উঠে। শুন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে মেধাবীর সারিতে,শুন্য হচ্ছে মায়ের বুক। দুর্নীতি করে লাইসেন্স পাচ্ছে মন্ত্রী, এম পির বদৌলতে, দেখার বা বলার কেউ নেই। হাইওয়েতে ধরা পরলে ঘুষ দিলে পার পেয়ে যাচ্ছে পাগল ড্রাইভাররা।
সব মিলিয়ে বাস্তবতার খাতায় শুধু নেই আর নেই!

বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতা। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে সচেতনাই মূখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আমরা লাশের কোন উদাহরণ আর টানতে চাইনা। উদাহরণ দিলে শেষ হবে না। কিভাবে সব প্রতিকূলতা পিছনে ফেলে সামনে চলতে পারি তাই বড় বিষয় এখন।
আর চাইনা রাস্তায় মানুষের আহাজারি আর পিছনে শয়তানের অট্রহাসি শুনতে!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন